১০৮ শিব মন্দির: বর্ধমানের এক অসাধারণ ঐতিহাসিক ও স্থাপত্য নিদর্শন

নবাবহাটের ১০৮ শিব মন্দির: মহারাণীর করুণার গল্প আর একশো আটটি শিবের সারি

আধ্যাত্মিক শান্তি আর ইতিহাসের সন্ধানে একদিন ঘুরে আসুন বুর্ধমানের বিখ্যাত ১০৮ শিব মন্দিরে — কলকাতা থেকে ডে ট্রিপের সবচেয়ে সুন্দর ও কাছের গন্তব্য।

১৭৮৮ সালের এক মহামারীর গল্প (History of 108 Shiv Mandir)

গল্পটা শুরু হয় আজ থেকে ২০০ বছরেরও বেশি আগে, যখন বুর্ধমান রাজবাড়ির দেউড়িতে সোনার শাঁখা বাজত। অষ্টাদশ শতকের তৃতীয় দশকে বুর্ধমান শহরে নেমে আসে ভয়ানক এক মহামারী। অসংখ্য মানুষ হারান জীবন, শহর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে শোক। তখন শাসনভার ছিল মহারাজ তিলকচাঁদের স্ত্রী মহারাণী বিষ্ণুকুমারী-এর (Maharani Bishnu Kumari Devi of Burdwan Raj) হাতে — কারণ রাজার মৃত্যুর পর ছেলে ছিলেন নাবালক। প্রজাদের দুঃখ দেখে রাণীর মন ভেঙে পড়ে, আর তিনি এক অভাবনীয় সিদ্ধান্ত নেন — প্রজাদের মনে ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি জাগিয়ে তুলে শোক কাটাতে হবে।

আর তেমনি ভাবে, ১৭৮৮ সালে নবাবহাটে শুরু হয় একশো আটটি শিব মন্দির তৈরির কাজ। দুই বছর পর, ১৭৯০ সালে সম্পন্ন হয় ১০৯টি শিব মন্দির — জপমালার ১০৮টি মণির মতো সারিবদ্ধভাবে, আর শেষে মেরু-চিহ্নের মতো আরেকটি মন্দির। জনশ্রুতি বলে, ১০৯তম মন্দির প্রতিষ্ঠার দিন প্রাঙ্গণে এক লক্ষ সাধু-মহাত্মার সমাগম হয়েছিল। আজও এই মন্দিরগুলি বাংলার আটচালা স্থাপত্যশৈলীর (Bengal Aat-chala architecture) এক অনন্য নিদর্শন — সমগ্র ভারতে এমন ১০৮ শিব মন্দির কমপ্লেক্স মাত্র দুটি, আর তার একটি এখানেই।

জীর্ণোদ্ধার — ১৯৬৫ সালের কাহিনি

সময়ের ভারে মন্দিরগুলি যখন জীর্ণ হয়ে পড়েছিল, তখন ১৯৬৫ সালে বিড়লা জনকল্যাণ ট্রাস্টের (Birla Jana Kalyan Trust) আর্থিক সহায়তায় এগুলি সংস্কার করা হয়। আজ মন্দির পরিচালনার দায়িত্বে আছেন বুর্ধমানের মহারাজাধিরাজ উদয়চাঁদ মহতাব প্রতিষ্ঠিত অছি পরিষদ। ২০১৩ সালে পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তরের উদ্যোগে সামনে গড়ে ওঠে পার্কিং আর পরিচ্ছন্ন সবুজ চত্বর — যা ভ্রমণকে করে তুলেছে আরও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ।

মন্দির চত্বরে কী কী দেখবেন?

পশ্চিমমুখী প্রবেশদ্বার দিয়ে ভিতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে দুই সারিতে জপমালার মতো সাজানো শিব মন্দিরের সারি — যেন অনন্তকাল ধরে জপ করছে একটি পরা বিষ্ণুকুমারী। প্রতিটি মন্দিরের ভিতরে আছে কালো কষ্টিপাথরের শিবলিঙ্গ, আর প্রাঙ্গণের একপাশে ১০৮টি ঘণ্টার সারি — জনশ্রুতি অনুসারে, প্রতিটি মন্দিরে পূজা দিয়ে এই ঘণ্টা বাজালে মনের সব ইচ্ছা পূর্ণ হয়।

🛰
১০৮+১টি আটচালা মন্দির — জপমালার মতো সাজানো অনন্য স্থাপত্য।
🔔
১০৮টি ঘণ্টা — ৫ সারিতে সাজানো, পূজা শেষে বাজানোর পরম্পরা।
🚠
দুটি বিশাল পুকুর — মন্দির কমপ্লেক্সকে ঘিরে শান্ত জলের পরিবেশ।
👦
তীর্থযাত্রীদের জন্য আবাস — দোতলা ভবনে থাকার ব্যবস্থা, তীর্থযাত্রীদের জন্য।
💧
কালো শিবলিঙ্গ — ১০৯টি মন্দিরের প্রতিটিতে কষ্টিপাথরের শিবলিঙ্গ ও গৌরীপট্ট।

কবে যাবেন? দর্শনের সেরা সময় ও মহাশিবরাত্রি মেলা

১০৮ শিব মন্দির সকাল ৫টা থেকে দুপুর ১২টা এবং বিকেল ৪টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত দর্শনের জন্য খোলা থাকে। শ্রাবণ মাসের সোমবারে এখানে ভক্তের ভিড় সবচেয়ে বেশি। আর বছরের সেরা সময় হলো মহাশিবরাত্রি — সাত দিন ধরে চলে বিশাল মেলা, লক্ষ লক্ষ ভক্ত প্রতিটি শিবলিঙ্গের মাথায় দুধ ও গঙ্গাজল ঢেলে বেলপাতায় পূজা দেন। চৈত্র সংক্রান্তিতে চড়ক পূজাও এখানে জাঁকজমকের সাথে পালিত হয়। শীতের পরিষ্কার সপ্তাহেও (অক্টোবর–ফেব্রুয়ারি) এখানে পর্যটকদের জন্য আবহাওয়া খুব আরামদায়ক।

কীভাবে পৌঁছাবেন? নবাবহাট ১০৮ শিব মন্দির যাওয়ার উপায় (How to Reach)

রেলপথ কলকাতার হাওড়া বা সেওলদা থেকে বুর্ধমান রেল স্টেশনে মাত্র ১.৫ ঘণ্টা; স্টেশন থেকে রিকশা/অটোতে প্রায় ১০ মিনিটে নবাবহাট বাসস্ট্যান্ড, মন্দির সেখান থেকেই কাছে।
সড়কপথ কলকাতা থেকে NH19 (গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড) ধরে প্রায় ১১০ কিমি; গাড়ি বা বাসে ২.৫–৩ ঘণ্টা। মন্দিরের সামনে পার্কিং আছে।
এন্ট্রি ফি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে — দর্শন, পার্কিং, প্রাঙ্গণ সবকিছু ফ্রি; জুতা রাখার নগণ্য মূল্য।
থাকার ব্যবস্থা মন্দির কমপ্লেক্সের দোতলা ভবনে তীর্থযাত্রীদের জন্য আবাস আছে; কাছেই বুর্ধমান শহরের বিভিন্ন হোটেল।

ভ্রমণের বাজেট ও কিছু কাজের টিপস

নবাবহাট ১০৮ শিব মন্দির কলকাতা থেকে Kolkata to Bardhaman day trip এর জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় গন্তব্যগুলির একটি। সকালে রেলে রওনা, সারাদিন মন্দির দর্শন, কাছের ট্রয়েকোটা মসজিদ বা বুর্ধমান রাজবাড়ি দেখে সন্ধ্যায় ফেরা — এভাবে একটি পুরো দিন অনায়াসে কাটানো যায়। খাবার ও যাতায়াত ধরলে প্রতি জন ৫০০–৮০০ টাকার মধ্যেই সম্পূর্ণ যাত্রা সম্ভব।

টিপস হিসেবে বলি — মহাশিবরাত্রির মেলায় যেতে চাইলে আগে থেকেই ট্রেনের টিকেট বুক করুন, কারণ এই সময়ে ভিড় লক্ষাধিক হয়। নবাবহাট ১০৮ শিব মন্দির পারিবারিক ভ্রমণ, ধার্মিক পর্যটন আর ফটোগ্রাফি — সব ধরনের দর্শনার্থীর জন্যই একটি আদর্শ গন্তব্য, এবং একদিনে ঘুরে দেখাও সম্পূর্ণ সম্ভব। সাথে নিন পানি, টুপি ও আরামদায়ক জুতো — মন্দিরের চাতাল আর পুকুরের পাড় ঘুরে দেখতে গিয়ে অনেকটাই হাঁটতে হয়। সকালে মন্দিরে ভক্ত কম থাকে, তাই ছবি তোলার জন্য সকালের সময়টাই সোনা।

সচরাচর জিজ্ঞাসা — 108 Shiv Mandir FAQ

১০৮ শিব মন্দির কোথায় অবস্থিত?

পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব বুর্ধমান জেলার বুর্ধমান শহরের নবাবহাট (Nababhat) বাসস্ট্যান্ডের কাছেই, বুর্ধমান রেল স্টেশন থেকে প্রায় ২ কিমি দূরে।

১০৮ শিব মন্দির কে ও কবে তৈরি করেছিলেন?

বুর্ধমান রাজবাড়ির মহারাণী বিষ্ণুকুমারী ১৭৮৮ সালে এই মন্দিরগুলি তৈরি শুরু করেন এবং ১৭৯০ সালে নির্মাণ সম্পন্ন হয়।

১০৮ শিব মন্দির দেখার সেরা সময় কবে?

মহাশিবরাত্রির সাতদিনব্যাপী মেলা, শ্রাবণের সোমবার এবং চৈত্র সংক্রান্তির চড়ক পূজা; পর্যটনের জন্য শীতের মাসগুলি (অক্টোবর–ফেব্রুয়ারি) সবচেয়ে আরামদায়ক।

কলকাতা থেকে ১০৮ শিব মন্দিরে কীভাবে যাব?

হাওড়া বা সেওলদা থেকে ট্রেনে বুর্ধমান স্টেশনে আসতে ১.৫ ঘণ্টা, সেখান থেকে অটো/রিকশায় ১০ মিনিটে নবাবহাট; গাড়িতে NH19 ধরে ২.৫–৩ ঘণ্টা।

সম্পূর্ণ ভ্রমণ গাইডটি পড়ুন

ইতিহাসের পাতায় এক বেলা কাটিয়ে আসতে আজই প্ল্যান করুন — নবাবহাট ১০৮ শিব মন্দির ভ্রমণ গাইড

--------------------------

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ছোট্ট সোনামণির বুদ্ধি বিকাশের জন্য সেরা ১০টি বাজেট-ফ্রেন্ডলি খেলনা

টেইলরদের জন্য সেরা টুলস ও ফিটনেস গাইড: কাজ হবে দ্রুত ও আরামদায়ক

বাঙালি রান্নাঘরের সেরা সঙ্গী: টপ রেসিপি বই ও আবশ্যক রান্নার সরঞ্জাম